Sunday, 31 January 2016

বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পাঁচটি দেশের গল্প / ড. মোহাম্মদ আমীন


১. ভ্যাটিকান সিটি

ভ্যাটিকান সিটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র। স্থলবন্দি এ দেশটি ইটালির রাজধানী রোমের মাঝখানে অবস্থিত।‘ইতালিয়ান চিটা ডেল ভ্যাটিক্যানো’ এবং ল্যাটিন ‘সিভিটার ভ্যাটিকানা’ হতে ভ্যাটিকান সিটি নামের উৎপত্তি। এর অর্থ ভ্যাটিকান পর্বতের উপর অবস্থিত শহর । ল্যাটিন ‘মোনস ভ্যাটিকানাস’  বাগভঙ্গী হতে বিখ্যাত পর্বত ‘ভ্যাটিকান’ নামের উৎপত্তি। ভ্যাটিকান পর্বতের চারিপাশে অবস্থিত উর্বর সমৃদ্ধ ভূমির নাম হতে ভ্যাটিকান
ভ্যাটিকানসিটি
পর্বত নামের উৎপত্তি। আবার অনেকে মনে করেন, ল্যাটিন ক্রিয়াপদ ‘ভ্যটিসিনারি  বা ভবিষ্যৎ বাণী বা ভবিষ্যবক্তা বা সৌভাগ্য বাণী ব্যক্তকারী’ বাগভঙ্গি হতে ভ্যাটিকান শব্দের উৎপত্তি। ভ্যাটিকান সিটির মোট আয়তন ৪৪ হেক্টর বা ১১০ একর। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে জনসংখ্যা ৮৪২ এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৮৭৭। রাজধানী ভ্যটিকান সিটি এবং মাথাপিছু  আয় ৪,৮৫৯। ধর্ম রোমান ক্যথলিক, সরকারি ভাষা ইতাালিয়ান। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি দেশটি ইতালি হতে স্বাধীনতা লাভ করে।  ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন ভ্যাটিকান সিটির বর্তমান পতাকা গৃহীত হয়। ভ্যাটিকান সিটির এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নাম পন্টিফিসাল কমিশন।ভ্যাটিকানের নাগরিকত্ব জন্ম দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নিয়োগের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। নিয়োগের সমাপ্তি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাটিকানি সিটির নাগরিকত্বের সমাপ্তি ঘটে। ভ্যাটিকান মিউজিয়ামকে পৃথিবীর বৃহত্তম ও আকর্ষণীয় মিউজিয়ামের অন্যতম বলে ধরা হয়। এটি ১৪.৫ কিলোমিটার লম্বা। ভ্যাটিকানি মউজিয়ামে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম সংগ্রহ। এ সংগ্রহগুলো পাশাপাশি সাজালে ৯ মাইল লম্বা হবে। যা পুরো ভ্যাটিকান সিটির চারিদেকে সাড়ে চার বার ঘুরিয়ে আনা যাবে। এ মিউজিয়ামে রক্ষিত প্রতিটি বস্তু দেখতে এক মিনিট করে সময় ব্যয় করলেও সবগুলো বস্তু দেখা শেষ করতে ৪ বছর সময় লাগবে। এখানে ১৪০০ কক্ষ আছে। ভ্যাটিকান সিটিতে অবস্থিত St. Peter’s Basilica বিশ্বের বৃহত্তম ক্যাথলিক চার্চ।প্রতি মঙ্গলবার সকালে পোপ শ্রোতৃবৃন্দ ও পূণ্যার্থীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।  ইতালিয়ান অধিবাসীরা তাদের করের ৮% সরকারকে না দিয়ে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষকে প্রদানে সরকারের অনুমতি আছে। ভ্যাটিকান সিটি পুরোটাই ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য। এটিই পৃথিবীর একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র, যার পুরো ভূখণ্ডই বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত।

ভ্যাটিকান সিটির নিজস্ব পাসপোর্ট আছে। পোপ, কার্ডিনাল, সুইস গার্ডের সদস্যবৃন্দ এবং পাদ্রিগণ এ পাসপোর্ট পেয়ে থাকেন। ভ্যাটিকান রেডিও স্টেশন ভ্যাটিকান গার্ডেনের ভেতর একটি টাওয়ারে অবস্থিত। প্রতিদিন এ রেডিও স্টেশন হতে ২০ ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস পন্টিফেইসাল সুইস গার্ড নামের ভ্যাটিকান গার্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তারা মূলত পোপের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী হিসাবে কাজ করে। বর্তমানে তারা ভ্যাটিকান সিটির সামরিক শক্তি হিসাবে কাজ করছে। সুইস গার্ড হতে হলে অবশ্যই ১৭৪ মিটার লম্বা, পুরুষ, ক্যাথলিক, সুইস, সুইস সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ১৯-৩০ বছর বয়সের হতে হয়।পোপ হচ্ছেন নির্বাচিত কিন্তু অবংশগত  রাজা। ভাটিক্যান রাজ্যের ওপর তার পূর্ণ বিচারিক, নির্বাহী এবং আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে।  বর্তমান ইউরোপে তিনিই একমাত্র পরম ক্ষমতার অধিকারী রাজা। নব নির্বাচিত পোপ যে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে Urbi et Orbi  বাক্যে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে আশীর্বাদ জানান তার নাম লগিয়া অব দা বেনেডিকশন বা আশীর্বচন-স্থান। অনেক পোপ সন্তানের পিতা ছিলেন। কথিত হয়, ক্রিস্টোফার কলম্বাস ছিলেন একজন পোপের সন্তান। ভ্যাটিকান সিটি পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যা রাতের বেলা একটি নির্দিষ্ট সময়ে গেট বন্ধ করে দেয়। 

২. মোনাকো 

 মোনাকো (Monaco)  পশ্চিম ইউরোপ অবস্থিত স্বাধীন রাষ্ট্র। এর আয়তন ২.০২ বর্গ কিলোমিটার (২৪৮-তম) এবং ২০১১ খ্রিস্টাব্দের হিসেব অনুযায়ী লোকসংখ্যা ৩৬৩৭১ (২১৭-তম)। জনসংখ্যার মাত্র ৬০০০ মোনাকো পাসপোর্টধারী। বাকিরা বিদেশি ও রেজিস্টার্ড। জনসংখ্যার মাত্র ৬০০০ মোনাকো পাসপোর্টধারী। বাকিরা বিদেশি ও রেজিস্টার্ড। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যা ঘনত্ব ১৮,০০৫। আয়তনে ভ্যাটিকান সিটির পর মোনাকো পৃথিবীর ২য় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় বিশ্বে প্রথম। মোনাকোর উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিমে ফ্রান্স এবং পূর্বে ভূমধ্যসাগর অবস্থিত। ১২৯৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মোনাকো রাষ্ট্রটি জেনোয়া হতে স্বাধীনতা লাভ করে।
 স্বাধীনতার পর হতে গ্রিমাল্ডি পরিবার মোনাকে  শাসন করে আসছে। ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ফ্রান্সের সঙ্গে একটা চুক্তি হয়েছে। সে চুক্তি অনুযায়ী গ্রিমাল্ডি রাজ পরিবারের যদি কোনো উত্তরাধিকারী না থাকে, তাহলে দেশটি ফ্রান্সের অধিকারে চলে যাবে। মোনাকোর ম্যাপ দেখলে মনে হবে একটি হাতির মাথা। যে মাথাটা অদ্ভুদ ভঙ্গীতে তার শুঁড় উঁচিয়ে ধরেছে। ল্যাটিন মোনিকাস  শব্দ হতে প্রাচীন গ্রিক শব্দ মোনোইকোস  শব্দের উদ্ভব। এর অর্থ একাকি বসবাস। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে মোনাকোর জিডিপি (পিপিপি) ৪.৬৯৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১,৩২,৫৭১। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৫.৪২৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১,৫৩,১৭৭ ইউএস ডলার। উভয় প্রকার মাথাপিছু আয় বিবেচনায় মোনাকোর স্থান বিশ্বে প্রথম। মোনাকোর জনগণের মাথাপিছু আয়ের কাছাকাছিও কোনো দেশ নেই। মুদ্রার নাম ইউরো।মোনাকোর প্রধান আকর্ষণ কাসিনো বা জুয়ার আখড়া। তবে মোনাকোর অধিবাসীদের জুয়া খেলা নিষিদ্ধ। এমনকি তারা ক্যাসিনো দেখার জন্যও যেতে পারে না। একসময় ক্যাসিনো ছিল সরকারের প্রধান আয়। তবে এখন জুয়ার আখড়া হতে কেবল ৫% আদায় করা হয়। বর্তমানে পর্যটন দেশটির প্রধান চালিকা শক্তি। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে হতে মোনাকে আয়কর মুক্ত দেশ। জনগণকে কোন আয়কর দিতে হয় না।তাই পৃথিবীর তাবৎ রাষ্ট্রের ধনকুবেরগণ আয়, উপভোগ ও অর্থ ব্যয়ের জন্য মোনাকোকে এক নম্বর স্থান হিসেবে বেছে নেয়। করমুক্তির সুযোগ লাভের জন্য ইউরোপের বহু ধনী মোনাকোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। 

৩. নাউরু

প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ নাউরু (Nauru) পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। এটি মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে মাইক্রোনেশিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। সরকারি নাম রিপাবলিক অব নাউরু। ৩০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত কিরিবাতির বানাবা দ্বীপ নাউরুর নিকটতম প্রতিবেশি। ইয়ারেন নাউরুর ডি-ফ্যাক্টো রাজধানী। এটিই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যার কোনো দাপ্তরিকভাবে ঘোষিত রাজধানী নেই।  এ দেশে কোন বেকার নেই। চাওয়ামাত্র যোগ্যতা অনুসারে চাকরি দেয়া হয়। এ দেশের জনগণকে কোন আয়কর দিতে হয় না।প্রতি ৩৪ জন লোকের জন্য একটি হাসপাতাল বেড। অথচ আমেরিকায় প্রতি ১৫২ জনের জন্য ১টি হাসপাতাল বেড।নাউরুর মোট জনসংখ্যার ৯৫ ভাগ অতিরিক্ত ওজনের ভার ন্যুজ। এ
জন্য এটাকে বিশ্বের সবচেয়ে মোটা লোকের দেশও বলা হয়। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি দেশটি যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। এ দেশের কোন নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনী নেই। মাত্র ১০০ সদস্যের একটি নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে।প্রস্থ বরাবর দেশটি অতিক্রম করতে মাত্র গড়ে ৫৬ মিনিট সময় লাগে। নাউরু-এর এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নাম পার্লামেন্ট। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ও তিমি শিকারি জন ফার্ন ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এ দ্বীপে অবতরণ করেন। তিনি দ্বীপের নাম দেন (Pleasant Island) বা মনোজ্ঞ দ্বীপ।  পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে নাউরু রাখা হয়। নাউরুয়ান ভাষার শব্দ এনাওয়েরো  হতে নাউরু শব্দের উদ্ভব। অর্থ আমি সমুদ্র সৈকতে যাই। এটি একটি অভ্যাসজ্ঞাপক বাক্য।   সবার লক্ষ ছিল সমুদ্র। একজন যদি জানতে চাইত, কোথায় যাচ্ছ, অন্যদিক হতে উত্তর আসত এনাওয়েরো। তারপর পাল্টা প্রশ্ন এবং একই উত্তর এনাওয়েরো। কথিত হয়, অভিবাসীদের এ ডাক ও প্রশ্নোত্তর হতে নাউরু নামের উদ্ভব। তারা মৎস্য শিকার বা চাষের জন্য সমুদ্র তীরের দিকে যাওয়ার সময় বলত আমি সমুদ্রে যাচ্ছি বা এনাওয়েরো, অপভ্রংশে নাউরু। নাউরুর মোট আয়তন ২১ বর্গকিলোমিটার বা ৮.১ বর্গমাইল। আয়তন বিবেচনায় এ দেশটি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম এবং পৃথিবীর তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। ছোট দেশের তালিকায় ভ্যাটিকান সিটি ও মোনাকোর পর নাউরুর অবস্থান। জনগণের সিংহভাগ খ্রিস্টান।  মোট জনসংখ্যার ১০% বাহাই। এটি একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাত বিবেচনায় পৃথিবীতে সর্বোচ্চ।

২০১১ খ্রিস্টাব্দের আদম শুমারি অনুযায়ী নাউরুর জনসংখ্যা ১০,০৮৪ এবং  ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৮০ জন। আয়তন বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ২৩৯ তম কিন্তু  জনসংখ্যা বিবেচনায় ২৩৪-তম বহৃত্তম দেশ। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ২৫-তম। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, নাউরুর জিডিপি (পিপিপি) ৩৬.৯ মিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২,৫০০ ইউএস ডলার। নাউরুর কোনো নিজস্ব মুদ্রা নেই, অস্ট্রেলিয়ান ডলার এ দেশের প্রচলিত মুদ্রা।
নাউরুর মানচিত্র ডিম্বাকৃতি। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র। বহু বছর যাবত ফসফেট ছিল দ্বীপের অন্যতম অর্থকর দ্রব্য। হাজার হাজার বছর যাবত সামুদ্রিক পাখির পতন ও মৃত দেহ থেকে এ ফসফেট উৎপন্ন হয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে নাউরুর জনসংখ্যাই সবচেয়ে কম। ‘আওয়ার এয়ারলাইন’ একমাত্র বিমান সংস্থা যদ্বারা নাউরু পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে।এ দেশে ১৫০০ ইহুদি রয়েছে।

৪. টুভালু

টুভালু (Tuvalu)পৃথিবীর চতুর্থতম ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র। এটি প্রশান্ত মহাসাগরে হাওয়াই ও অস্ট্রেলিয়ার মাঝপথে অবস্থিত।  কিরিবাতি, নাউরু, সামোয়া ও ফিজি এর নিকটবর্তী দেশ। দেশটির প্রথম অধিবাসী পলিনেশিয়ানস। সামোয়া ও টোঙ্গা হতে পলিনেশিয়নরা ওখানে ছড়িয়ে পড়ে। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে আলভারো ডি মেন্ডানা প্রথম ইউরোপীয়ান, যিনি টেরা অস্ট্রেলিয়ার সন্ধানে সমুদ্রযাত্রাকালীন দ্বীপটিতে অবতরণ করেন। টুভালুর এক কক্ষবিশিষ্ট আইন সভার নাম পার্লামেন্ট। টুভালু শব্দের অর্থ অষ্টদ্বীপ বা পরস্পর সংলগ্নভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। আটটি পরস্পর নিকটবর্তী দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত বলা হলেও টুভালুতে প্রকৃতপক্ষে নয়টি দ্বীপ রয়েছে। তবে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে নিউলাকিতাদের অভিবাসনের পূর্বে কেবল আটটি দ্বীপে মনুষ্যবসতি ছিল। তাই নয়টি দ্বীপ হলেও তখন আটটি দ্বীপকে
অধিবাসীরা প্রকৃত অর্থ তাদের নিজস্ব দ্বীপ এবং উপযুক্ত মনে করত। এ জন্য ভূখ-টি টুভালু বা অষ্টদ্বীপ নামে পরিচিত হয়। আবার অনেকে মনে করেন টুভালু অর্থ একত্রে দাঁড়িয়ে থাকা আট (eight standing together)। এর প্রাচীন নাম ছিল এলিস আইল্যান্ড । ব্রিটিশ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী স্যার এডওয়ার্ড এলিসের বিখ্যাত জাহাজ রেবেকা পণ্যসামগ্রী নিয়ে ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে এ দ্বীপে নোঙ্গর করেছিল। তাই তার সম্মানে  নাম রাখা হয় এলিস দ্বীপ। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে এটি গিলবার্ট আইল্যান্ড (আধুনিক কিরিবাতি) হতে পৃথক হবার পর এলিস আইল্যান্ড নামটি পরিবর্তন করে টুভালু  রাখা হয়। টুভালুর আয়তন ২৬ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ১১,২০০। কিরিবাতি, নাউরু, সামোয়া ও ফিজি টুভালুর নিকটবর্তী প্রতিবেশি রাষ্ট্র। পলিনেশিয়ান দ্বীপ জাতি অধ্যুষিত ছোট এ ভূখ-টি ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর ব্রিটিশের অধিনতা থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর দেশটি জাতিসংঘের ১৮৯-তম সদস রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করে। 

জনসংখ্যা বিবেচনায় টুভালু পৃথিবীর ততৃীয় ও আয়তন বিবেচনায় চতুর্থ ক্ষুদ্রতম দেশ।এর মোট আয়তন ২৬ বর্গ কিলোমিটার বা ১০ বর্গমাইল।  ২০১২ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, মোট জনসংখ্যা ১০,৮৩৭ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ৪৭৫.৮৮। আয়তন বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ২৩৬-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় ২২৯-তম। আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় পৃথিবীর ২২-তম জনবহুল দেশ। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯৬% পলিনেশিয়ান ও ৪% মাইক্রোনেশিয়ান। অধিকাংশ লোক খ্রিস্টান তবে কোনো মুসলিম নেই। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, টুভালুর জিডিপি (নমিনাল) ৩৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৩৮৬১ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম টুভালুয়ান ডলার ও অস্ট্রেলিয়ান ডলার। রাজধানী  ফুনাপুটি । ছোট এ দেশটি প্রতিবছর কোনো কিছু না করে অকারণেই বলা যায়, ৪ মিলিয়ন ডলার রয়্যালিটি পায়। এটি শুধু তাদের ডোমেইন নাম (.tv) ব্যবহারের জন্য। এ দেশে কোনো রেলপথ নেই। উল্লেখ্য, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের গবেষণামতে, পৃথিবীর ৯৩টি দেশে রেলপথ নেই। ওশেনিয়া মহাদেশে ১৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দেশে রেলপথ নেই। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, মহাসড়ক ৮ কিলোমিটার। এর পুরোটাই পাকা, কোনো কাচা সড়ক নেই। সমুদ্র বন্দর ১টি এবং বিমানবন্দর ১টি। ফিশিং ও পর্যটন আয়ের প্রধান উৎস। দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। উল্লেখ্য তিনি বর্তমানে পৃথিবীর ১৬টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা রাণী। অবশ্য এটি সম্পূর্ণ আলঙ্করিক পদ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ভূমিকা থাকে না।

 ৫. স্যান ম্যারিনো  

স্যান ম্যারিনো (san Marino) পৃথিবীর পঞ্চম ক্ষুদ্রতম দেশ এর দাপ্তরিক নাম রিপাবলিক অব স্যান ম্যারিনো ইতালিয়ান পেনিনসুলা অবস্থিত দেশটির চারিদিকে ইতালি আয়তন ৬১. বর্গ কিলোমিটার এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী লোকসংখ্যা ৩১,২৪৭ মুদ্রাইউরো এবং দাপ্তরিক ভাষা ইতালিয়ান জনগণের মাথাপিছু আয় ৪৪২০৮ মার্কিন ডলার ৩০১ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর দেশটি রোমান সাম্রাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর দেশটির সংবিধান গৃহীত হয় স্যান ম্যারিনো পৃথিবীর প্রাচীনতম সার্বভৌম সাংবাধিনাকি প্রজাতন্ত্র ।  ইতালিয়ান নাগরিক সেন্ট ম্যারিনাস এর নাম থেকে স্যান
ম্যারিনো নামের উৎপত্তি। তিনি ছিলেন পাথর কেটে ভবন তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ একজন কারিগর। তৎকালীন আর্বি বর্তমান ক্রোয়েশিয়ায় তিনি বসবাস করতেন। রোমান সম্রাট তাকে মৃতদণ্ডে দণ্ডি করলে ম্যারিনাস জীবন রক্ষার জন্য ৩০১ খ্রিস্টাব্দে মাউন্ট টিটানোতে আত্মগোপন করেন। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি গোপনে গোপনে এলাকাটিকে বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ করে তোলেন। ওখানে পাথর কেটে তিনি এলাকাটিকে বাসযোগ্য করে তোলেন। এজন্য লোকজন এলাকাটির নাম দেন সান ম্যারিনো। সান ম্যারিনোর মোট আয়তন ৬১.২ বর্গকিলোমিটার বা ২৪ বর্গমাইল।  ২০১২  খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, সান ম্যারিনোর জনসংখ্যা ৩২,৫৭৬ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটালে লোকসংখ্যা ৫২০ জন। আয়তন বিবেচনায় সার ম্যারিনো পৃথিবীর ২২২-তম বৃহত্তম দেশ।  ৩০১ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর দেশটি রোমান স্রামাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রজাতন্ত্র। সান ম্যারিনোর এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নাম গ্র্যান্ড এন্ড জেনারেল কাউন্সিল।২০০৮ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, সান ম্যারিনোর জিডিপি (পিপিপি) ১.১৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৩৫,৯২৮ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ১.৪৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৩৫,৯২৮ ইউরো। মুদ্রার নাম ইউরো। রাজধানী সিটি অব সান ম্যারিনো। ৩০১ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর দেশটি রোমান সাম্রাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। সরকারি ভাষা ইটালিয়ান। অধিবাসীদের ৯৭% রোমান ক্যাথলিক।   

 সান ম্যারিনোর ওয়েম্বলি স্ট্যাডিয়ামে আসন সংখ্যা ৫৬,৩১৮, তবে তা সবসময় শূণ্য পড়ে থাকে। এ স্ট্যাডিয়ামের আসন সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। সান ম্যারিনো, নাউরু, টুভালু ও পালাউ জাতিসংঘের কম জনসংখ্যাবিশিষ্ট সদস্যরাষ্ট্র। ডোগানা হচ্ছে সান ম্যারিনোর বৃহত্তম শহর। পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান সান ম্যারিনোর। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ৮ অক্টোবর সান  ম্যারিনোর বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়। এত বছর পরও সংবিধানকে পরিবর্তন করতে হয়নি।  ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল সান ম্যারিনোর পতাকা প্রথম গৃহীত হয়।পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সামারিক ফোর্স সান ম্যারিনোর। জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব ইটালীয় সেনাবাহিনীর ওপর ন্যস্ত। সান ম্যারিনো পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মানুষের চেয়ে গাড়ির সংখ্যা বেশি। ইউরোপীয় কাউন্সিলের দেশসমূহের মধ্যে সান ম্যারিনোর জনসংখ্যা সবচেয়ে কম। এটি ৮টি মাইনর মিউনিসিপালিটি নিয়ে গঠিত। সান ম্যারিনোর জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ২.২%। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে মোট ২ মিলিয়ন পর্যটক সান ম্যারিনো ভ্রমণ করে। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্র সান ম্যারিনোর সঙ্গে কুটনীতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে সান ম্যারিনো সরকার সম্মানজনক নাগরিকত্ব প্রদান করে। যখন ওয়াশিংটন ডিসিতে সান ম্যারিনোর দুতাবাস ছিল, তখন কিন্তু সান ম্যারিনোতে ওয়াশিংটনের দুতাবাস ছিল না, ইটালিতে ছিল। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সদস্য না হলেও, সান ম্যারিনো ইউরো ব্যবহার করে।পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম সামারিক ফোর্স সান ম্যারিনোর। জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব ইটালীয় সেনাবাহিনীর ওপর ন্যস্ত। সান ম্যারিনো পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মানুষের চেয়ে গাড়ির সংখ্যা বেশি। ইউরোপীয় কাউন্সিলের দেশসমূহের মধ্যে সান ম্যারিনোর জনসংখ্যা সবচেয়ে কম। এটি ৮টি মাইনর মিউনিসিপালিটি নিয়ে গঠিত। সান ম্যারিনোর জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ২.২%। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে মোট ২ মিলিয়ন পর্যটক সান ম্যারিনো ভ্রমণ করে। এ দেশের সড়কপথের দৈর্ঘ্য ২২০ কিলোমিটার। দুটি নদী দেশটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও এখানে কোনো বন্দর নেই।

No comments:

Post a Comment